Press "Enter" to skip to content

যে প্রজন্ম গন্তব্যে পৌঁছে দেখল, সামনে আবার নতুন সূচনালেখা

কিছু গল্পের প্রকৃত গুরুত্ব তার প্রধান চরিত্রের মধ্যে নয়, বরং সেই চরিত্রকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

কয়েক শ তরুণ-তরুণী একজন নৃবিজ্ঞানীর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন।

তিনি কোনো জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নন। চলচ্চিত্রের তারকা নন। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতের কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বও নন।

তিনি অল্প সময়ে ধনী হওয়ার পরামর্শ বিক্রি করেন না। কয়েকটি সহজ নিয়ম অনুসরণ করলেই জীবনে সাফল্য আসবে, এমন প্রতিশ্রুতিও দেন না।

তাঁর নাম বিয়াও শিয়াং।

চীনের ওয়েনঝৌ শহরে জন্ম নেওয়া এই গবেষক পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজিতে গবেষণা পরিচালনা করছেন।

অভিবাসন, শ্রম, সামাজিক পরিবর্তন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণার বিষয়।

নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত ও গবেষণাগত অভিজ্ঞতা।

কিন্তু আসল গল্প শুরু হয় তখন, যখন তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য তরুণদের ভিড়ে মিলনায়তন পূর্ণ হয়ে যায়।

তাঁরা তাঁর বক্তব্য শোনেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দেন এবং বক্তৃতা শেষে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করেন।

ঘটনাটিকে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের অপ্রত্যাশিত তারকাখ্যাতি হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

কিন্তু তাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আড়ালে থেকে যাবে।

এখানে মূল সংবাদ শুধু অধ্যাপক নন।

মূল সংবাদ হলো তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষমাণ তরুণদের দীর্ঘ সারি।

তাঁরা আসলে কী খুঁজছেন?

গত কয়েক দশকে চীন অসাধারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

বিশাল শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে। শহর সম্প্রসারিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। দ্রুতগতির রেলপথ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে।

লক্ষ লক্ষ পরিবার এমন জীবনযাত্রার মান অর্জন করেছে, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে প্রায় অকল্পনীয় ছিল।

এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সফল জীবনের একটি পরিচিত ধারণা।

মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো।

ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হও।

স্থিতিশীল চাকরি অর্জন করো।

নিজের বাড়ি কেনো।

পরিবার গড়ে তোলো।

এবং মা-বাবার প্রজন্মের তুলনায় উন্নত জীবনযাপন করো।

এই জীবনদর্শন অবশ্য কেবল চীনের নিজস্ব নয়।

ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার বহু সমাজেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে বেড়ে উঠেছে।

শিক্ষা, পরিশ্রম এবং ব্যক্তিগত শৃঙ্খলাই উন্নত ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেবে—এই বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন একজন মানুষ সমাজের নির্ধারিত সমস্ত শর্ত পূরণ করেও আবিষ্কার করেন যে প্রতিশ্রুত ফলাফল আর নিশ্চিত নয়।

চীন আজও বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিল্প, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যশক্তি।

দেশটির অর্থনৈতিক অর্জন এবং তরুণ সমাজের একটি অংশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ পরস্পরবিরোধী নয়।

দুটি বাস্তবতা একই সঙ্গে বিদ্যমান থাকতে পারে।

একটি দেশ অত্যাধুনিক দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণ করতে পারে, অথচ সেই দেশের একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক নিজের জীবনের গন্তব্য সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকতে পারেন।

একটি দেশ উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারে, অথচ তার তরুণ কর্মীরা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে পারেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে, অথচ সেই দেশের পরিবারগুলো আবাসন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নতির প্রচলিত ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হতে পারে।

এটি পরিসংখ্যানগত কোনো বিরোধ নয়।

এটি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক।

বিয়াও শিয়াং এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরেছেন।

তার একটি হলো শূন্যে ঝুলে থাকার অনুভূতি।

মানুষ ক্রমাগত পড়াশোনা করছে, কাজ করছে, প্রতিযোগিতা করছে এবং নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে।

কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও সব সময় সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কখনো কখনো সমস্ত শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে শুধু বর্তমান অবস্থান ধরে রাখার জন্য।

এ যেন একটি ছোট পাখি, যাকে বাতাসে একই জায়গায় ভেসে থাকার জন্য অবিরাম ডানা ঝাপটাতে হয়।

সম্ভবত প্রকৃত ক্লান্তির কারণ শুধু অবিরাম উড়তে থাকা নয়।

বরং এক মুহূর্তের জন্যও ডানা থামানো যাবে না—এই বিশ্বাস।

শিয়াংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো আমাদের নিকটবর্তী জগতকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

বর্তমান পৃথিবীতে আমরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জানতে পারি ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো কিংবা ব্রাসেলসে কী ঘটছে।

আমরা আন্তর্জাতিক সংঘাত, বিশ্ব অর্থনীতি এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক অনুসরণ করি।

অথচ পাশের বাড়িতে বসবাসকারী মানুষটির নাম পর্যন্ত হয়তো জানি না।

দূরের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আমাদের কাছে এসেছে।

কিন্তু নিজের চারপাশের পৃথিবী যেন ক্রমশ অপরিচিত হয়ে উঠছে।

ব্যক্তিমানুষ এবং বিশাল বিশ্বের মাঝখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর রয়েছে, যার প্রতি আমরা ক্রমেই কম মনোযোগ দিচ্ছি।

আমাদের প্রতিবেশী।

সহকর্মী।

স্থানীয় দোকানপাট।

নিজের পাড়া।

পরিবার এবং প্রতিদিনের সামাজিক সম্পর্ক।

শিয়াং আমাদের এই নিকটবর্তী জগতকে পুনরাবিষ্কার করার আহ্বান জানান।

তাঁর এই চিন্তার গুরুত্ব বিশেষভাবে বোঝা যায়, যখন বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তাকে মানুষ সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে মনে করতে শুরু করে।

অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছে।

আমি কেন পিছিয়ে পড়ছি?

অন্যরা বাড়ি কিনছে।

আমি কেন পারছি না?

এত পড়াশোনা করার পরও কেন একটি স্থিতিশীল চাকরি পাচ্ছি না?

একজন মানুষ এমন প্রশ্ন করলে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যুক্তিসংগত।

কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন একই ধরনের প্রশ্ন করেন, তখন তাঁদের চারপাশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এর অর্থ ব্যক্তিগত দায়িত্ব অস্বীকার করা নয়।

বরং স্বীকার করা যে মানুষ সমাজ ও অর্থনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না।

শিক্ষাব্যবস্থা, আবাসনব্যবস্থা, শ্রমবাজার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং পরিবারের প্রত্যাশা—সবকিছুই ব্যক্তিগত জীবনের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।

ঠিক এখানেই চীনের এই গল্প আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অর্জন করে।

বাংলাদেশ, ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য বাংলাভাষী সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি চীনের মতো নয়।

তাদের নিজস্ব ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান, শ্রমবাজার এবং উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তাই বিভিন্ন দেশের তরুণদের অভিজ্ঞতাকে একই ছাঁচে ফেলা উচিত নয়।

তবু শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, অভিবাসন এবং পরিবারের প্রত্যাশা নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন সমাজের তরুণদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

সমস্যার কারণ ভিন্ন হতে পারে।

সমাধানের পথও ভিন্ন হতে পারে।

কিন্তু মানুষের প্রশ্নটি আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম।

সমস্ত নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর যদি দেখা যায়, দৌড় চলাকালীনই গন্তব্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে কী করা উচিত?

সম্ভবত এই প্রশ্নই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন একজন নৃবিজ্ঞানী তরুণদের কাছে এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছেন।

শিয়াং নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি দেন না।

সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না।

ভবিষ্যতের সমস্ত অনিশ্চয়তা দূর করার কোনো জাদুকরি উপায়ও তাঁর কাছে নেই।

তিনি বরং এমন কিছু অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করছেন, যা অসংখ্য মানুষ ইতিমধ্যেই অনুভব করছেন, কিন্তু সব সময় ব্যাখ্যা করতে পারছেন না।

আর এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে।

শুধু এই প্রশ্ন করার পরিবর্তে যে আমি কোথায় ভুল করেছি, আরও একটি প্রশ্ন তোলা সম্ভব হয়।

আমার চারপাশে আসলে কী পরিবর্তন ঘটছে?

প্রথম প্রশ্নটি আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করায়।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি একটি জানালা খুলে দেয়।

বড় সামাজিক পরিবর্তন সব সময় রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না।

কখনো কখনো পরিবর্তনের প্রথম লক্ষণ দেখা যায়, যখন একটি প্রজন্ম নিজেদের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার জন্য নতুন শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করে।

চীনে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ইনভলিউশন’ ধারণা।

অন্তহীন প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর মনোভাব প্রকাশ করছে ‘লাইং ফ্ল্যাট’।

আর শিয়াংয়ের আলোচনায় উঠে আসছে শূন্যে ঝুলে থাকার অনুভূতি এবং নিজের নিকটবর্তী জগতকে পুনরাবিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা।

নতুন বাস্তবতা ব্যাখ্যা করার জন্য পুরোনো ভাষা যখন যথেষ্ট থাকে না, তখনই প্রায়ই নতুন ধারণা ও শব্দের জন্ম হয়।

এই কারণেই বিয়াও শিয়াংয়ের গল্প শুধু একজন গবেষকের গল্প নয়।

এটি শুধু চীনের তরুণ সমাজের গল্পও নয়।

এটি বিভিন্ন দেশের মানুষের সামনে উপস্থিত একটি বৃহত্তর প্রশ্নের গল্প।

পৃথিবী যখন আমাদের বোঝার ক্ষমতার চেয়েও দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন আমরা নিজেদের স্থান কোথায় খুঁজে পাব?

সম্ভবত সেই উত্তর সব সময় দূরের কোনো দেশে কিংবা ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত গন্তব্যে লুকিয়ে থাকে না।

সম্ভবত প্রথমে আমাদের আবার মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে নিজের বাড়ির দরজার ঠিক বাইরে থাকা পৃথিবীটিকে।

© 🖋️ The Global Observer | 2026 — All Rights Reserved


© 2026 SalaStampa.eu, world press service – All Rights Reserved – Guzzo Photos & Graphic Publications – Registro Editori e Stampatori n. 1441 Turin, Italy
তথ্যসূত্র: BBC; ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজি; চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো।

22 views